আফছার উদ্দিন লিটন

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর দেশে বিরাজ করছে তীব্র গ্যাস সংকট। বিএনপি সরকার আসার পর তা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ পরিস্থিতিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ওপর চাহিদা বাড়ছে। অথচ দেশে নামমাত্র এলপিজির উৎপাদন হয়। কিন্তু রান্না থেকে শুরু করে শিল্প ও পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে এ জ্বালানি।
এলপিজি গ্যাসের এ সরবরাহ কাজে লাগিয়ে বাজারের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছে বসুন্ধরা, টোটাল, আইগ্যাস, ওমেগা, পদ্মা, যমুনা গ্রুপের মতো বেশ কিছু সিন্ডিকেট। পাঁচ বছরে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১ সালের এপ্রিলে ৯৭৫ টাকা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের এপ্রিলে দাম বেড়ে দাঁড়ায়- এক হাজার ১৪০ টাকা। অর্থাৎ ৫৬৫ টাকা বা প্রায় ৯৯ শতাংশ বৃদ্ধি। এই সময়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দফায় দফায় দাম বাড়ানোর পাশাপাশি কমিয়েছে; তবে সার্বিক সময়কালের পর্যায়ক্রমে ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে এলপিজির দাম। সর্বশেষ চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম এক হাজার ১৪৫ টাকা হলেও বাস্তবে বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় দুই হাজার ১৫০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায়। ফলে একদিকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি এবং অন্যদিকে কৃত্রিম সংকট ও অবৈধ মজুতের অভিযোগে চাপে পড়েছেন ভোক্তারা। এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা অবশ্য দাবি করছেন, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই এবং সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের আমদানি তথ্যও দেশে পর্যাপ্ত সরবরাহের কথা তুলে ধরেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত দামে বিক্রি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি ও অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। কিন্তু ধারাবাহিক এসব উদ্যোগের পরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে- সরকার নির্ধারিত দামে আদৌ এলপিজি পাবেন কি না সাধারণ ভোক্তারা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারির ঘাটতিই ভোক্তাদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
২০২১ সালের ১২ এপ্রিল দেশে প্রথমবার বেসরকারি পর্যায়ের এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। তখন ১২ কেজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৯৭৫ টাকা। এরপর বিশ্ববাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে দাম পরিবর্তন করা হয়। প্রথম বছরেই দাম কয়েক দফা ওঠানামা করে। ২০২১ সালের এপ্রিলে দাম ৯৭৫ টাকা থেকে মে ও জুনে দাম কমে ৯০৬ ও ৮৪২ টাকায় নেমেছিল। এরপর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচদফা দাম বাড়ে। ওই বছরের নভেম্বরের শেষে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় এক হাজার ৩৩ টাকা। পরে ডিসেম্বরে এক দফায় ৮৫ টাকা কমিয়ে এক হাজার ২২৬ টাকা করা হয়।
২০২২ সালে দাম বাড়ে সাতদফা, আর দাম কমে পাঁচ বার। তবে বছর শেষে ডিসেম্বরে গিয়ে দাম দাঁড়ায় এক হাজার ২৩৭ টাকা আর পরের জানুয়ারিতে যা ছিল এক হাজার ১৪৮ টাকা। ২০২৩ সালেও সাতদফা বাড়ানোর বিপরীতে পাঁচদফা দাম কমানো হয়। ওই বছরের শুরুতে এক হাজার ২৩২ টাকা থেকে ডিসেম্বরের শেষে দাম দাঁড়ায় এক হাজার ৪০৪ টাকা। যদিও ওই বছর সবচেয়ে কম দাম ছিল জুন মাসে ৯৮৯ টাকা।
২০২৪ সালে সাত দফায় সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়। বছরের শুরুতে এক হাজার ৪৩৩ টাকা থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে এক হাজার ৪৭৪ এবং মার্চে এক হাজার ৪৮২ টাকায় ওঠে। এরপর কয়েক দফা কমা-বাড়ার পর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে দাম ছিল এক হাজার ৪৫৫ টাকা। ২০২৫ সালে দাম বাড়ানোর প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল। বছরজুড়ে দুই দফা বাড়ানোর বিপরীতে একাধিক দফায় দাম কমানো হয়। নভেম্বর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম কমে এক হাজার ২১৫ টাকায় নেমেছিল। আর সর্বোচ্চ দাম ছিল ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ৪৭৮ টাকা। চলতি বছরের (২০২৬) প্রথম চার মাসে আবারও এলপিজির দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। জানুয়ারিতে এক হাজার ২৫৩ টাকা থেকে ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ৩৫৬ টাকা হয়। পর মাসে দাম কমানোর পর ১৫ টাকা কমে দাম দাঁড়ায় এক হাজার ৩৪১ টাকা। মার্চে দাম অপরিবর্তিত ছিল। এরপর এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৮৯ টাকা বাড়ানো হয়। প্রথম দফায় ৩৮৭ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৯৪০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ ২০২১ সালের এপ্রিলে ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ৯৭৫ টাকা; যা ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে দাঁড়ায় এক হাজার ৯৪০ টাকা। দেখা যাচ্ছে, পাঁচ বছরে দাম বেড়েছে ৯৬৫ টাকা, যা প্রায় ৯৯ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিলে পর আগস্টে এক দফায় ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭০ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৫৮৮ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। তবে এর আগে জুনে ৫৫ টাকা এবং জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়। সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে আরও ১৩ টাকা কমিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিইআরসি দফায় দফায় এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে বাজারে এই দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। বরং নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার কিনে থাকেন গ্রাহকরা। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির যে সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি, বাজারে সেই সিলিন্ডার এক হাজার ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার ৫০০ টাকা ধরে বিক্রি হচ্ছে। একদিকে সরকারের দোহাই দিচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। এনবিআরের সূত্র হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, গত আগস্ট ২০২৬ মাসে এক লাখ ২৭ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন এবং চলতি সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসে (২২ তারিখ পর্যন্ত) এক লাখ ১৮ হাজার ৭৯২ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। প্রদর্শিত উপাত্ত অনুযায়ী, দেশে এলপিজির জোগান ও মজুত পরিস্থিতি ভালো। সুতরাং বর্তমানে এলপি গ্যাসের কোনো ধরনের সংকট নেই বলে সভায় জানান এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা। এরপর গত ৩০ সেপ্টেম্বর দেশের কোথাও এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী। সচিবালয়ে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত অনলাইন বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন। সেদিন মন্ত্রী বলেছিলেন, দেশে এলপিজির সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবে কিছু এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হতে পারে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কোথাও কেন সংকটের কথা শোনা যাচ্ছে এবং কেন অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখে তথ্য ও প্রমাণসহ প্রতিবেদন পাঠাতে ডিসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১ অক্টোবর দেশে এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক রয়েছে বলে জানিয়েছে লোয়াব। পর্যাপ্ত সরবরাহের পরও বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি বা অবৈধ মজুত করা হলে সরকারের কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে সংগঠনটি। পর পর এতগুলোর উদ্যোগের পর এলপিজির দাম সাধারণ মানুষ সরকার নির্ধারিত দামে পাবে কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। যে হারে দাম বাড়ানো হচ্ছে, তাতে ভোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে তা সামাল দেওয়া খুব কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, বিইআরসির নির্ধারিত দামে কোথাও বাজারে এলপিজি বিক্রি হয় না। ফলে ভোক্তাদের আরও বেশি দামে কিনতে হয়।
বর্তমানে দেশে এলপিজির চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। আর দীর্ঘমেয়াদি আমদানিনির্ভরতা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। দেশে বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট সরকারি উৎপাদন ও বেসরকারি আমদানি মিলিয়ে এলপিজির পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৩৪ মেট্রিক টন দাঁড়ায়। তার মধ্যে মাত্র ২০ হাজার ৩৮৬ মেট্রিক টন সরকারি উৎপাদন। দেশে বিপিসির অনুমোদিত তিন বেসরকারি রিফাইনারির মাত্র ২৫ হাজার ১৯১ টন এলপিজি উৎপাদন করে আর ১৫ লাখ ৪৮ হাজার ৫৭৯ দশমিক ১৩ মেট্রিক টন বেসরকারি খাতে আমদানি হয়েছে। পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
চাহিদার তুলনায় দেশীয়ভাবে এলপিজির উৎপাদন খুবই নগণ্য। মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও তেল পরিশোধনাগার থেকে সামান্য পরিমাণ এলপিজি পাওয়া যায়। সেজন্যই চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে পাইপলাইনের গ্যাস সংকট ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বাড়ছে এলপিজির ব্যবহার। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, ডলারের বিনিময় হার ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর দেশের এলপিজি বাজারের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। সূত্র জানায়, অপরিশোধিত (ক্রুড) তেল শোধনাগারের সময় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বিভিন্ন উপজাত পাশাপাশি উৎপাদন হয় এলপিজি। রিফাইনারির ডিসটিলেশন ও পরিশোধন প্রক্রিয়ায় ক্রুড তেল থেকে প্রোপেন ও বিউটেনের মতো হালকা হাইড্রোকার্বন আলাদা করা হয়। ওসব গ্যাসীয় উপাদান প্রক্রিয়াজাত ও বিশুদ্ধ করে তরল অবস্থায় সংরক্ষণ করে এলপিজি হিসেবে বাজারজাত করা হয়। মূলতঃ দেশে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের উপজাত হিসেবে পাওয়া যায় এলপিজি। তাছাড়া সিলেট গ্যাস ফিল্ডে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় গ্যাসের সঙ্গে আসা তরল হাইড্রোকার্বন বা এনজিএল সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সব প্ল্যান্টে এনজিএল উৎপাদন সম্ভব নয়। বিশেষ ধরনের প্ল্যান্টের মাধ্যমে তা আলাদা করা হয়। কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদিত এনজিএল প্রক্রিয়াজাত করে এর একটি অংশ থেকে এলপিজি এবং বাকি অংশ থেকে কনডেনসেট তৈরি করা হয়। দেশে যে গ্যাস উৎপাদনের সঙ্গে যে তেল আসে, ওই তেলের একটি উপাদান হচ্ছে এনজিএল। আর ওই এনজিএল থেকেই এলপিজি পাওয়া যায়। সূত্র আরো জানায়, সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল) বিগত অর্থবছরে ২০ হাজার ৪ ৫০ টন, বিপিসির অনুমোদিত তিন বেসরকারি রিফাইনারির মধ্যে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ১৯ হাজার ৬১১ টন, একুয়া রিফাইনারি ২ হাজার ৮০ টন এবং স্ট্যান্ডার্ড পেট্রো ৩ হাজার ৪৯০ টন এলপিজি বাজারে সরবরাহ করে আর ১৭ লাখ ৬ হাজার ১৯৬ টন এলপিজি বেসরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন আর বেসরকারি খাতে ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন আমদানি করা হয়। ওই বছর মোট সরবরাহ ছিল প্রায় ১৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। তার মধ্যে সরকারি উৎপাদনের অংশ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ। বিপরীতে আমদানির অংশ ছিল ৯৯ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের এলপিজি সরবরাহের প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতের আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিগত পাঁচ বছরেও দেশের এলপিজি বাজারে সরাসরি সরকারি উৎপাদনের অংশ কখনোই ১ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি হয়নি। যদিও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি উৎপাদন আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়েছে। ফলে ১২ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন থেকে তা বেড়ে ২০ হাজার ৩৮৬ মেট্রিক টন হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও মোট সরবরাহের তুলনায় সরকারি উৎপাদনের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৩০ শতাংশ। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি আমদানি বেড়েছে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন থেকে আমদানি বেড়ে ১৫ লাখ ৪৮ হাজার ৫৭৯ দশমিক ১৩ মেট্রিক টন হয়েছে। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি উৎপাদনের তুলনায় বেসরকারি আমদানির পরিমাণ প্রায় ৭৬ গুণ বেশি ছিল। কিন্তু বেসরকারি খাত বিপুল পরিমাণ এলপিজি আমদানি করায় আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম, ডলার বিনিময় হার, জাহাজভাড়া ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের এলপিজির বাজারের সরাসরি প্রভাব পড়ছে। কিন্তু সব প্ল্যান্টে ওই এনজিএল উৎপাদন হয় না। শুধু কৈলাশটিলা কূপে পাওয়া যায়। ওই এনজিএল থেকেই এলপিজি পাওয়া যায়। আর যে পরিমাণ এনজিএল পাওয়া যায় তার ৪০ শতাংশ এলপিজি হয়। কিন্তু দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমে আসায় এনজিএল উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। আপাতত এনজিএল বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকেও পেট্রোল, ডিজেল, অকটেনের মতো বাই প্রোডাক্ট হিসেবে সামান্য এলপিজি আসে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডে দৈনিক ১শ থেকে ১ হাজার বোতল ( সাড়ে ১২ কেজির) এলপিজি উৎপাদন সম্ভব হয়। এখন কথা হলো- এলপিজি গ্যাসের সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করে দাম বৃদ্ধি করছে কারা? পকেট এবং ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা ঢুকাচ্ছে কারা? তারা সিলিন্ডার এলপিজি গ্যাসের বাজার অস্থির করে তুলেছে। তারা কি প্রাতিষ্ঠানিক এবং হতদরিদ্র মানুষের বাঁচতে দেবে না? তাদের কি বাঁচার অধিকার নেই? অথচ, বাসা বাড়িতে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে সিলিন্ডার এলপিজি গ্যাসের পরিবর্তে লাইনের গ্যাসের চাহিদা বেশি। সারা দেশে তিতাস, বাখরাবাদ এবং কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির লাইনের গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ নেই। শেখ হাসিনার আমলে ২০১৪ কিংবা ২০১৫ সাল থেকে লাইনের গ্যাসের সরবরাহ দেশে নেই। বাসা বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়ারা সিলিন্ডার এলপিজি গ্যাসের তুলনায় লাইনের গ্যাস পছন্দ করার কারণ হলো- এটি সাশ্রয়ী এবং রান্না করার কাজে ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে সিলিন্ডার এলপিজি গ্যাস বহন করা কঠিন। ওজন অনেক ভারি। ১২ কেজি, ২৫ কেজি এলপিজি গ্যাস কিংবা তারও বেশি ওজনের সিলিন্ডার বহন করে ৪র্থ, ৫ম কিংবা ৬ষ্ঠ তলায় ওঠানামা করা অনেক কষ্টের। এ কারণে লাইনের গ্যাসের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ বেশি। এলপিজি বাটে অনিয়ম প্রতিরোধের দায়িত্ব বিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার ও বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অসাধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। দরকার হলে আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন করে লাইসেন্স দিতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম ও অতীতের সাংবাদিকদের বলেছেন- “এলপিজি ব্যবসা আরও ব্যক্তিগত বা বৈঠক সম্পর্ক নয় যে, ইচ্ছামত দাম বাড়াবে এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে না।” আমিও তাঁর সাথে একমত। এভাবে তো রাষ্ট্র চলতে পারে না। এভাবে তো বিইআরসি এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ করে দরিদ্র মানুষকে শোষণ করতে পারে না। এটা জুলুম, এটা মধ্যযুগীয়। কেননা প্রান্তিক হতদরিদ্র মানুষ কোনো কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছে না।
লেখক: সাংবাদিক ও সম্পাদক।

