সমাজের প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ শৈশব, মানসম্মত শিক্ষা এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল সমাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবতায় দারিদ্র্য, অসচেতনতা, সামাজিক বৈষম্য, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের মতো নানা প্রতিবন্ধকতা অনেক শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের জন্য শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করতে চান সাপ্তাহিক ‘এজাহার’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী।আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভবিষ্যতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণ, শিশু অধিকার সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং শিশুশ্রম নিরসনে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী। তাঁর এই আগ্রহ বাস্তব উদ্যোগে রূপ নিলে স্থানীয় পর্যায়ে শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরনা চৌধুরী বাড়িতে জন্ম নেওয়া এই তরুণের শিক্ষাজীবন, সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং শিশুদের কল্যাণে কাজ করার আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরা হলো।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরনা চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মতিউর রহমান চৌধুরী এবং মাতার নাম ফরিদা বেগম। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি শিক্ষাজীবনকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকা। এই দুই ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে মানুষের অধিকার ও সামাজিক সমস্যা নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে সাংবাদিকতা একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। অন্যদিকে আইন বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান শিশুদের সুরক্ষা ও অধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলো বুঝতে সহায়ক হতে পারে।
শিক্ষাজীবন: সরকারি মুসলিম হাই স্কুল থেকে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা
সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় সাধারণ শিক্ষার ধারাবাহিকতায়। তিনি ২০১৪ সালে সরকারি মুসলিম হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০১৬ সালে ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) সম্পন্ন করেন।পরবর্তী সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে আইন বিভাগে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে আইন বিষয়ে অনার্স এবং ২০২২ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।আইন বিষয়ে অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে নাগরিক অধিকার, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। শিশুদের অধিকার সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং শিশুশ্রমের মতো বিষয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে এসব জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।তবে আইন বিষয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইন, নীতিমালা এবং শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত জ্ঞান অর্জন করাও জরুরি। কারণ শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক তথ্য, দায়িত্বশীল উদ্যোগ এবং আইনসম্মত পদক্ষেপ।
সাংবাদিকতায় দায়িত্ব ও জনস্বার্থে কাজ করার সম্ভাবনা
সাইফুল ইসলাম চৌধুরী সাপ্তাহিক ‘এজাহার’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিকতা সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যা সামনে আনা এবং মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।সমাজে অনেক শিশু রয়েছে, যারা বিভিন্ন কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়তে পারে। কোনো শিশু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিদ্যালয় ছেড়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হতে পারে, আবার কোথাও সামাজিক চাপ ও অসচেতনতার কারণে অল্প বয়সে বিয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব বিষয় যথাযথ তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা হলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব।সাংবাদিকতার মাধ্যমে শিশুদের সমস্যা তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ কিংবা শিশুশ্রমের শিকার কোনো শিশুর পরিচয় প্রকাশের কারণে যেন সে নতুন করে সামাজিক ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।সাইফুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যতে শিশুদের অধিকারবিষয়ক সচেতনতা তৈরির কাজে ব্যবহার করতে পারেন। স্থানীয় পর্যায়ে শিশুদের সমস্যা, শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা এবং বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের সামাজিক প্রভাব নিয়ে তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন প্রকাশ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়
একটি শিশুর জীবনে শিক্ষা, নিরাপত্তা, পুষ্টি, ভালোবাসা এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব শিশু সমান সুযোগ নিয়ে জন্মায় না। অনেক পরিবার আর্থিক সংকটের কারণে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করতে পারে না। কোথাও শিক্ষাসামগ্রীর অভাব, কোথাও পারিবারিক অসচেতনতা, আবার কোথাও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা শিশুদের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে।সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর জন্য এ ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের চিহ্নিত করা, তাদের পরিবারকে শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহে সহযোগিতা করা হতে পারে সম্ভাব্য কর্মসূচির অংশ।এ ছাড়া দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী এবং সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে।শিশুদের সহায়তা শুধু সাময়িক আর্থিক অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কোনো শিশু কেন বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না, তার পরিবারের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন এবং কীভাবে তাকে নিয়মিত শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত রাখা যায়—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে।সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের আত্মমর্যাদা বজায় রাখা। সহায়তা যেন কোনো শিশুকে অপমানিত বা বৈষম্যের শিকার না করে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করার আগ্রহ
প্রতিটি শিশুরই নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা গ্রহণ, মতামত প্রকাশ এবং নির্যাতন ও শোষণ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রদান করে।কিন্তু অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা, সামাজিক অসচেতনতা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিশু তাদের প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।সাইফুল ইসলাম চৌধুরী শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করতে চাইলে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক আলোচনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথ্যভিত্তিক প্রচার, অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সংবাদপত্রে শিশু সুরক্ষাবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নিতে পারেন।বিশেষ করে শিশু নির্যাতন, অবহেলা, শিক্ষাবঞ্চনা কিংবা শোষণের ঘটনা সামনে এলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। শিশুদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করার অর্থ কেবল সমস্যার কথা বলা নয়; বরং সমস্যার কারণ চিহ্নিত করা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার পথ দেখানোও এর অংশ।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ: সচেতনতা গড়ে তোলার প্রয়োজন
বাংলাদেশের সমাজে বাল্যবিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। অল্প বয়সে বিয়ে হলে অনেক শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হতে পারে, নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।বাল্যবিবাহের পেছনে দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শুধু আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর না করে পরিবার ও সমাজের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করতে চাইলে কয়েকটি ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।প্রথমত, অভিভাবকদের মধ্যে মেয়েশিশুর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গঠনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা।দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও স্থানীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের বিষয়ে সতর্কতা বৃদ্ধি করা।
তৃতীয়ত, বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব এবং আইনগত বিধান সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও প্রতিবেদন প্রকাশ করা।চতুর্থত, কোথাও বাল্যবিবাহের আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা শিশু সুরক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা।বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী সাধারণভাবে বিয়ের ক্ষেত্রে পুরুষের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর এবং নারীর ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। আইনে নির্দিষ্ট শর্ত ও আদালতের নির্দেশসংক্রান্ত একটি বিশেষ বিধানও রয়েছে। তাই কোনো ঘটনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রযোজ্য আইনি বিধান ও পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবারকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করা, যা শিশুর দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শিশুশ্রম বন্ধে সচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগ
শিশুশ্রম শিশুদের শিক্ষা, স্বাভাবিক বিকাশ এবং নিরাপদ শৈশবের পথে বড় বাধা হতে পারে। দারিদ্র্য ও পারিবারিক সংকটের কারণে কিছু শিশু অল্প বয়সে উপার্জনের কাজে যুক্ত হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ বা শোষণমূলক পরিবেশে কাজ করতে হয়।সব ধরনের শিশুর কাজের পরিস্থিতি এক নয়। তবে যে কাজ শিশুর শিক্ষা ব্যাহত করে, তার স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষতি করে কিংবা তাকে শোষণের মুখে ঠেলে দেয়, তা প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে বিপজ্জনক কাজে শিশুদের নিয়োজিত করা তাদের সুরক্ষার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করার ক্ষেত্রে সাইফুল ইসলাম চৌধুরী স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে পারেন। শিশুরা কেন বিদ্যালয়ের পরিবর্তে কাজে যাচ্ছে, তাদের পরিবারের আর্থিক সমস্যা কী এবং কীভাবে তাদের পুনরায় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা যায়—এসব বিষয় চিহ্নিত করা প্রয়োজন।এ ক্ষেত্রে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজকর্মী, শ্রম অধিদপ্তর, প্রশাসন ও শিশু সুরক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় কার্যকর হতে পারে। শিশুশ্রমে যুক্ত কোনো শিশুকে শুধু কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তার পরিবারের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিকল্প সহায়তা এবং শিক্ষায় ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।সাংবাদিকতার মাধ্যমে শিশুশ্রমের বাস্তবতা তুলে ধরার সময় সংশ্লিষ্ট শিশুর পরিচয় গোপন রাখা, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। কোনো শিশুর ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের আগে তার সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে।
আইন ও সাংবাদিকতার সমন্বয়ে সামাজিক সচেতনতা
সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর শিক্ষাগত পটভূমিতে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা এবং পেশাগত পরিচয়ে সাংবাদিকতা—দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। এই দুই ক্ষেত্রের সমন্বয়ে শিশুদের অধিকার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং শিশুশ্রম নিরসনের মতো বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির সুযোগ রয়েছে।আইন বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান সামাজিক সমস্যার আইনি দিক বুঝতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে সাংবাদিকতা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সমস্যাকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে।তবে এসব ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। আইনসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বিধান যাচাই করা, অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং শিশুদের পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইন বিষয়ে ডিগ্রি থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ধরনের আইনগত সেবা দেওয়ার পেশাগত অনুমোদন পাওয়া যায় না—এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।শিশুদের কল্যাণে কাজ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, বাস্তব অভিজ্ঞতা, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা। এসবের সমন্বয় হলে সামাজিক উদ্যোগ আরও কার্যকর ও টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
পটিয়ায় শিশুদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কী করা সম্ভব?
পটিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিম্নলিখিত কার্যক্রম বিবেচনা করা যেতে পারে—
১. শিক্ষাসহায়তা কর্মসূচি: অসচ্ছল পরিবারের শিশুদের শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ ও বিতরণ এবং বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতির বিষয়ে সহযোগিতা।
২. শিশু অধিকারবিষয়ক সচেতনতা: বিদ্যালয়, পরিবার ও সামাজিক পরিসরে শিশুদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা।
৩. বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রচার: অভিভাবকদের সচেতন করা, মেয়েশিশুর শিক্ষা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া।
৪. শিশুশ্রম নিরসনে সহযোগিতা: শিশুশ্রমের কারণ চিহ্নিত করা, পরিবারকে সচেতন করা এবং শিশুদের শিক্ষায় ফেরানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ।
৫. তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা: শিশুদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে দায়িত্বশীল প্রতিবেদন প্রকাশ, যাতে সমাজের দৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে আকৃষ্ট হয়।
৬. স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক গঠন: শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সমাজকর্মী ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি।
এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণ, স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ, শিশু সুরক্ষা নীতি অনুসরণ এবং কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে কাজ করা গেলে ছোট পরিসরের উদ্যোগও ধীরে ধীরে বড় সামাজিক কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারে।
তরুণ প্রজন্মের প্রতি বার্তা
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই দেশের শিশু ও তরুণদের জন্য কতটা নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভরশীল।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি হলে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিশু অধিকার লঙ্ঘনের মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগ গড়ে উঠতে পারে।সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার মূল বিষয়ও হলো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করা এবং শিশুদের অধিকারসংক্রান্ত সমস্যার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
সমাজের প্রতিটি মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। কেউ শিক্ষা উপকরণ দিয়ে, কেউ পড়াশোনায় সহায়তা করে, কেউ সচেতনতা তৈরি করে, আবার কেউ শিশুদের সুরক্ষায় দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ভূমিকা রাখতে পারেন।একটি শিশুর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার উদ্যোগও সমাজের জন্য মূল্যবান অবদান হতে পারে।
প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ
সাপ্তাহিক ‘এজাহার’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর জীবনপথে রয়েছে চট্টগ্রামের পটিয়ায় বেড়ে ওঠা, স্কুল-কলেজের শিক্ষা, আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ততা। এর পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণ, শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করার আগ্রহ তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, নির্ভরযোগ্য তথ্য, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা। ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়া গেলে শিশুদের শিক্ষা ও সুরক্ষা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।একটি শিশুর শৈশব যেন দারিদ্র্য, অবহেলা, অল্প বয়সে বিয়ে কিংবা শোষণমূলক শ্রমের কারণে হারিয়ে না যায়—এমন সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব সবার। শিশুদের অধিকার রক্ষা শুধু একটি সামাজিক কর্মসূচি নয়; এটি মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ববোধেরও প্রতিফলন।
সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর প্রত্যাশিত পথচলার মূল বার্তা হতে পারে—শিশুর অধিকার সুরক্ষিত হোক, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ুক, আর প্রতিটি শিশু পাক শিক্ষা, নিরাপত্তা ও নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ।

