হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দেয়ার বিনিময়ে ইরানকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব যুক্তরাস্ট্রের

অনলাইন সংবাদদাতা

ইরান যদি হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধ নিশ্চিত করে, তবে দেশটির ওপর থেকে সব ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং সদ্যঘোষিত ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ বাতিল করার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শীর্ষ এক সূত্রের বরাতে চ্যানেল আল এরাবিয়ার এক প্রতিবেদনে একথা জানানো হয়।

সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সম্প্রতি তেহরান সফরকালে ওয়াশিংটনের এই প্রস্তাবটি ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেন।

সফরকালে আসিম মুনির ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাইয়ের সাথে এক বৈঠকে অংশ নেন। ওই বৈঠকের আলোচনাকে ‘স্পষ্ট ও নির্ণায়ক’ বলে অভিহিত করে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেলটি।

এই নতুন প্রস্তাবটিকে চলতি বছরের জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝাোতা স্মারকের (এমওইউ) উপাদানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি পৃথক কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ওই সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য ছিল—দুই দেশের বৈরিতা অবসান এবং আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা।
অনড় অবস্থানে ইরান

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাব দিলেও— ইরান তার মূল দাবিগুলো থেকে সরে আসেনি। তেহরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার, আটকে থাকা ১০০ থেকে ১২৩ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া, পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে সার্বিক যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের দাবিতে অনড় রয়েছে তেহরান।

উল্লেখ্য, গত ২৪ আগস্ট মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর এক সেকেন্ডারি-নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির উন্মোচন করেন। এর লক্ষ্য ছিল ইরানের ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, এভিয়েশন এবং শিপিং খাতের মতো—অবশিষ্ট অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোকে স্তব্ধ করে দেওয়া।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ গড়িয়েছে ৬ মাসে। সামরিক উপায়ে কাবু করতে না পেরে ইরানি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ চালু করে যুক্তরাষ্ট্র। একইসময়ে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাঙ্কার জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরানও একপ্রকার অবরুদ্ধ করে রাখে বিশ্ববাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে। এই প্রেক্ষাপটেই, বিশ্ব থেকে তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে কওরে ফেলতে সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যেখানে ইরানের সাথে লেনদেন করা যেকোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানকেও এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন এই নিষেধাজ্ঞার রূপরেখা তুলে ধরার সময় বেসেন্ট জানান, দীর্ঘদিন ধরে আমরা ইরানকে ‘কন্টেইনমেন্ট’ বা আটকানোর চেষ্টা করেছি। সেই নীতি থেকে সরে আসা হচ্ছে। এবার তেহরানের সামনে দুটি পথ খোলা থাকবে, হয় বৈশ্বিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, নয়তো স্বাভাবিক অর্থনীতিতে ফেরা। এরমধ্যে যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে বাধ্য করতেই এই নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই নতুন কূটনৈতিক প্রয়াসটি এমন এক সময়ে এলো যখন দু’দেশের আলোচনা বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এর আগে জুনে ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার মাধ্যমে মার্কিন নৌ-অবরোধ সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়, এসময় হরমুজ প্রণালিও আংশিকভাবে খুলে দেয় তেহরান। কিন্তু উভয়পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সংঘাতে জড়ালে– সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলও ফের বাধাগ্রস্ত হয়।

সর্বশেষ এই মার্কিন প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে কিছু জানাননি। তবে রেজাই পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে জানিয়েছেন যে, তেহরান এ বিষয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ আলোচনা চালিয়ে যাবে।

এদিকে পৃথক এক বার্তায় চীনা কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন একতরফা নিষেধাজ্ঞার কারণে বেইজিং ইরানের সঙ্গে তার বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক পরিবর্তন করবে না।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালি একটি অতিসংবেদনশীল জলপথ। এমতাবস্থায়,অবাধ নৌচলাচলের বিষয়ে যেকোনো টেকসই চুক্তি— বৈশ্বিক তেল বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে, এই দীর্ঘায়িত অচলাবস্থা উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিকে আরও তীব্রতর করার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব এবং ইরানের অনমনীয় শর্তাবলির মধ্যে ব্যাপক ব্যবধানই একটি দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর জটিলতাকে তুলে ধরছে।

Similar Articles

Advertismentspot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত