ছোট্ট কুঁড়েঘর থেকে পটিয়ার সাজ্জাদ আজ জাতীয় ফুটবল দলে

পটিয়া সংবাদদাতা

একসময় পটিয়ার দক্ষিণ গোবিন্দারখীলের ছোট্ট কুঁড়েঘরটিই ছিল সাজ্জাদ হোসেনের পৃথিবী। বাঁশের বেড়া আর জং ধরা টিনের চালের সেই ঘরে বৃষ্টি হলে পানি পড়ত। কখনো খাবার জুটত না পুরো পরিবারের। দিনমজুর বাবার সামান্য আয়েই চলত সংসার। কিন্তু এত অভাবের মধ্যেও সাজ্জাদের স্বপ্ন ছিল একটাই—ফুটবলার হওয়া।

স্কুলে পড়ার সময় পাশের মাঠে বড়দের ফুটবল খেলা দেখেই তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে একটি ফুটবল কিনে পাড়ায় খেলতে শুরু করেন। ২০০৬ সালের দিকে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘পটিয়া জুনিয়র স্পোর্টিং ক্লাব’। এরপর পটিয়া ব্রাদার্স ইউনিয়নে অনুশীলনের সুযোগ পেলেও অভাবের কারণে নিয়মিত মাঠে থাকা সম্ভব হতো না। কখনো বাবার সঙ্গে কাজে যেতে হয়েছে, কখনো বড় ভাইদের সঙ্গে। এমনকি কিছুদিন এনজিওতেও চাকরি করেছেন। তবুও পথচলা থামাননি সাজ্জাদ। এলাকার হাজী মোহাম্মদ নবী সওদাগরের দেওয়া একজোড়া বুট যেমন তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিল, তেমনি পটিয়া ব্রাদার্স ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এ টি এম মুহিবুল্লাহ চৌধুরীর উৎসাহ তাঁকে নতুন করে মাঠে ফিরিয়ে আনে। ২০১০ সালে তাঁর অনুপ্রেরণায় নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন সাজ্জাদ।

এরপর ২০১২ সালে বিকেএসপির খেলোয়াড় বাছাইয়ে দেড় শতাধিক খেলোয়াড়ের মধ্য থেকে মাত্র পাঁচজন নির্বাচিত হন, তাঁদের একজন ছিলেন সাজ্জাদ। চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে পটিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ের ফুটবলে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি।

২০১৬ সালে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর তাঁর ক্যারিয়ারে আসে বড় পরিবর্তন। ২০২১-২২ মৌসুমে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেন। আর ২০২২ সালে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে অভিষেক হয় বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে। বর্তমানে তিনি ঢাকার রহমতগঞ্জ এমএফসি ক্লাবে খেলছেন।

একসময় যে ছেলেটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এলাকার মানুষ সংশয় প্রকাশ করতেন, সেই সাজ্জাদ এখন নিজের উপার্জনে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা খরচ করে বানানো পাকা দোতলা বাড়িতে থাকেন। ঘরের ভেতর সাজানো তাঁর বিভিন্ন ক্রেস্ট, সনদ ও জার্সি। ফুটবল শুধু তাঁর নিজের জীবনই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে তাঁর পরিবারের জীবনও।

২০১৭ সালে বাবা কবির আহমদ মারা যাওয়ার পর খেলাধুলাই হয়ে ওঠে পরিবারের হাল ধরার পথ। ছোট ভাইয়ের জন্য পটিয়ায় গ্রিল ওয়ার্কশপের দোকানও করেছেন তিনি।

সাজ্জাদের গল্পটা তাই শুধু একজন ফুটবলারের জাতীয় দলে খেলার গল্প নয়। এটা অভাবের সঙ্গে লড়াই করে স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প।

Similar Articles

Advertismentspot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত