চট্টগ্রামের পটিয়ার আশিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন হারুন ইসলামাবাদী।

অনলাইন ডেস্ক

চট্টগ্রামের পটিয়ার আশিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন হারুন ইসলামাবাদী। ১৯৩৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই আলেম পরবর্তী জীবনে শিক্ষকতা, লেখালেখি, অনুবাদ, সাংবাদিকতা ও সমাজ সংস্কারের নানা ক্ষেত্রে কাজ করেন। তিনি ছিলেন আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ার তৃতীয় মহাপরিচালক এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় সভাপতি। ১৯৯০ সালে বিশ্ব মুসলিম লীগের বাংলাদেশ শাখার পরিচালকও নিযুক্ত হন। প্রায় ১৪টি ভাষায় তাঁর দক্ষতা ছিল।

তাঁর বাবা ইসমাইল ও মা উম্মে হাবিবা। দাদা কাজী গোলাম মোস্তফা। বড় ভাই ছিলেন ইসহাক আল গাজী। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে বেড়ে ওঠা হারুন ১৯৪২ সালে মাকে এবং ১৯৫২ সালে বাবাকে হারান। বড় ভাইদের কাছে কোরআনের প্রাথমিক শিক্ষা নেওয়ার পর কিছুদিন ভাটিখাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েন। ১৯৪৬ সালে ভর্তি হন নাজিরহাট বড় মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে। পরে ১৯৪৯ সালে আশিয়া এমদাদুল উলুম মাদ্রাসায় এবং ১৯৫১ সালে আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ায় ভর্তি হন।

১৯৬০ সালে জামিয়া পটিয়া থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন আজিজুল হক, হাজী মুহাম্মদ ইউনুস, ইমাম আহমদ, ইসহাক আল গাজী, আলী আহমদ বোয়ালভী ও নুরুল ইসলাম কদীম। উচ্চশিক্ষার জন্য ১৯৬১ সালে দারুল উলুম দেওবন্দে গেলেও ভারতের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। পরে পাকিস্তানের জামিয়া আশরাফিয়া, লাহোর থেকে ১৯৬২ সালে পুনরায় দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। এরপর জামিয়া মাদানিয়ায় উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে ১৯৬৩ সালে দেশে ফেরেন। পাকিস্তানে তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ ইদ্রিস কান্ধলভি, রসূল খান, জামিল আহমদ থানভী ও খালিদ মাহমুদ। দেশে ফিরে মাসিক মদীনার প্রতিষ্ঠাতা মুহিউদ্দীন খানের কাছেও বাংলা ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

কর্মজীবনের শুরুতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উর্দু ভাষায় প্রকাশিত একমাত্র দৈনিক ‘পাসবান’-এর বার্তা সম্পাদক এবং পরে সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকার ফরিদাবাদে প্রতিষ্ঠা করেন ‘এদারাতুল মাআরিফ’। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন এবং মুহাম্মদ ইউনুসের নির্দেশে মাসিক ‘আত তাওহীদ’-এর সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাংলাদেশ দূতাবাসে আরবি, বাংলা ও ইংরেজি ভাষার অনুবাদক হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পান। ১৯৭৭ সালের ১ মার্চ আবুধাবি সুপ্রিম কোর্টে অনুবাদক হিসেবে যোগ দেন। পাশাপাশি আবুধাবির ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত খতিব ছিলেন। ১৯৮৫ সালে আবুধাবি বেতারের ইসলাম ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রযোজক ও উপস্থাপক হিসেবে যোগ দিয়ে পরে অনুবাদ বিভাগের প্রধান হন। ১৯৯০ সালে বিশ্ব মুসলিম লীগ তাঁকে বাংলাদেশ শাখার পরিচালক নিযুক্ত করে।

১৯৯১ সালে মুহাম্মদ ইউনুস অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর অনুরোধে দেশে ফিরে হারুন ইসলামাবাদী জামিয়া পটিয়ার সহকারী পরিচালক হন। ১৯৯২ সালে তিনি জামিয়া পটিয়ার মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান। একই সময়ে তিনি বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তানজিমে আহলে হকের সভাপতি, সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সভাপতি, ইসলামি রিলিফ কমিটির সভাপতি এবং তাহফীজুল কুরআন সংস্থা বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্যসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ছোট-বড় প্রায় ৫০টি মাদ্রাসার পরিচালক এবং শতাধিক মাদ্রাসার মজলিসে শুরার সদস্যও ছিলেন।

জামিয়া পটিয়ার মহাপরিচালক থাকাকালে শিক্ষাব্যবস্থায়ও বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জামিয়া পটিয়ার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পন্ন করেন। সাধারণ শিক্ষিতদের জন্য ১৯৯৭ সালে জামিয়া পটিয়ায় শর্টকোর্স বিভাগ চালু করেন। তাঁর সময়ে জামিয়ার গভীর নলকূপ, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও কেন্দ্রীয় তোরণ নির্মিত হয়। ১৯৯২ সালে ফিকহের জটিল ও নতুন সমস্যার সমাধানের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামি গবেষণা পরিষদ।

সাহিত্য ও প্রকাশনার ক্ষেত্রেও তাঁর ছিল বিস্তৃত কর্মযজ্ঞ। ১৯৯৭ সালে আরবি ও বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘আন-নাদী আস-সাকাফী’। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলা ও আরবি পত্রিকা ছিল ‘দ্রোহ’ ও ‘আস-সাহওয়া’। ১৯৯২ সালে জামিয়া পটিয়া থেকে প্রকাশিত ‘বালাগুশ শরক’ ছিল তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটি আরবি পত্রিকা। ধর্মীয় বই প্রকাশের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘আল বালাগ প্রকাশনী’। সারাদেশের মক্তবগুলোকে একই নিয়মে পরিচালনা এবং মক্তব শিক্ষকদের ভাতা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ফোরকানিয়া মক্তব শিক্ষা বোর্ড। নওমুসলিমদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নওমুসলিম ফাউন্ডেশন।

শিক্ষা ও সমাজসেবার পাশাপাশি তিনি ইংরেজি, বাংলা, উর্দু, আরবি, ফার্সি, পশতু, চীনা, বর্মী, তুর্কি, গুজরাটি ও থাইসহ প্রায় ১৪টি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। বিভিন্ন ভাষায় লেখালেখি ও বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি ইসলামের বাণী প্রচার করতেন। লন্ডনের জাতীয় টেলিভিশনেও তাঁর ইংরেজি বক্তব্য প্রচারিত হয়েছিল। ১৯৭৬ সাল থেকে ব্যক্তিগতভাবে ও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাসস্থান, নলকূপ, মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণসহ অসহায়-গরিব পরিবারের সহায়তা, বিধবা-ভাতা ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার খরচ বহন করতেন। ১৯৮৮ সালের বন্যায় দুর্গত এলাকাতেও ত্রাণ বিতরণ করেন।

লেখালেখির পাশাপাশি অনুবাদেও তাঁর অবদান ছিল। তাঁর রচনার মধ্যে ‘ফাযায়েলে সাদাকাত’ অনুবাদ, ‘আহকামুস সুলতানিয়া’, ‘ইসলামি অর্থনীতি’, ‘মুয়াত্তা ইমাম মালেক’ অনুবাদ এবং ‘আমাকে পড়ো’ উল্লেখযোগ্য। ঢাকার ‘এদারাতুল মাআরিফ’-এ সংরক্ষিত তাঁর বহু লেখার পাণ্ডুলিপি পরে দুর্বৃত্তদের আগুনে নষ্ট হয়ে যায়।

তাঁর নামের শেষে ‘ইসলামাবাদী’ যুক্ত করার পেছনেও রয়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাস। চট্টগ্রাম জেলার পূর্বনাম ‘ইসলামাবাদ’-এর স্মৃতি থেকেই তিনি নিজের নামের সঙ্গে ‘ইসলামাবাদী’ যুক্ত করেন। পরবর্তীতে হারুন ইসলামাবাদী নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।

২০০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নয়, তাঁর মৃত্যুর তারিখ হিসেবে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৩ বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন বড় ভাই ইসহাক আল গাজীর ইমামতিতে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে জামিয়া পটিয়ার মাকবারায়ে আজিজীতে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর।

চট্টগ্রামের পটিয়ার আশিয়া গ্রাম থেকে শুরু হওয়া হারুন ইসলামাবাদীর জীবন একসময় ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ-বিদেশের শিক্ষা, সাংবাদিকতা, অনুবাদ, ধর্মীয় গবেষণা ও সমাজসেবার বিস্তৃত পরিসরে। তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান, প্রকাশনা ও শিক্ষামূলক উদ্যোগগুলো তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনেরই নানা অধ্যায় হয়ে আছে।

Similar Articles

Advertismentspot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত