দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ পটিয়ায় স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে একটি আধুনিক ও মডেল হাসপাতালে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। একই সঙ্গে হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫১ করার উদ্যোগ এবং কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস সেবা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
আজ ৩ অক্টোবর ২০২৬ পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা, জনবল, রোগীদের সুযোগ-সুবিধা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ও স্যালাইন সরবরাহসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে খোঁজ নেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বৃহত্তর এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালটিকে মডেল হাসপাতালে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান।
পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের Facility Registry-তেও এটি পটিয়া উপজেলার সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে বলে পরিদর্শনকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মন্ত্রীকে জানানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী ভর্তি থাকেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই রোগীর চাপ বিবেচনায় হাসপাতালটিকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে টেন্ডার কার্যক্রম শুরুর কথা রয়েছে।
হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়লে শুধু পটিয়া নয়, আশপাশের বৃহত্তর এলাকার রোগীরাও সরকারি পর্যায়ে আরও বেশি চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
পটিয়ার মানুষের জন্য ঘোষিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ডায়ালাইসিস সেবা চালুর পরিকল্পনা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পটিয়া হাসপাতালে ডায়ালাইসিস রোগীদের জন্য ১০টি শয্যা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আগামী দুই বছরের মধ্যে হাসপাতালে ১০টি ডায়ালাইসিস মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ২০ জন রোগী ডায়ালাইসিস সেবা নিতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে কিডনি রোগীদের নিয়মিত ডায়ালাইসিসের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই বড় শহরের হাসপাতাল বা নির্দিষ্ট ডায়ালাইসিস সেন্টারের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে যাতায়াত, সময় ও ব্যয়ের চাপ রোগী ও পরিবারের ওপর পড়ে। পটিয়ায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সেবা চালু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অনেক রোগীর জন্য চিকিৎসা পাওয়ার পথ সহজ হতে পারে।
তবে ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরই এই সেবা কার্যকরভাবে পাওয়া যাবে—তাই সেবা চালুর নির্দিষ্ট তারিখ, রোগী গ্রহণের নিয়ম, খরচ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অবকাঠামো সম্পর্কে পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় জনবল সংকটের বিষয়টিও উঠে আসে। মন্ত্রী হাসপাতালের প্রয়োজন অনুযায়ী ৯ জন জনবল পদায়নের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে হাসপাতালে উন্নতমানের প্যাথলজি সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। ভর্তি রোগীদের প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা হাসপাতাল থেকেই করার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ওষুধ ও স্যালাইন সরবরাহ এবং রোগীদের খাবারের মান নিশ্চিত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়ার কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে।
এ ছাড়া প্রসূতি মায়েদের জন্য ২০টি এবং নবজাতকদের জন্য ২০টি শয্যার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসকদের উপস্থিতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা, ওষুধ ও স্যালাইন সরবরাহ এবং ভর্তি রোগীদের খাবারের মান সম্পর্কে খোঁজ নেন। এ ধরনের সরেজমিন তদারকির মাধ্যমে হাসপাতালের বাস্তব চিত্র বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্যসেবা শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা এবং নিয়মিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পটিয়া হাসপাতালকে মডেল হাসপাতালে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অবকাঠামোর পাশাপাশি মানবসম্পদ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
পটিয়া ও আশপাশের এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, উপজেলা পর্যায়েই যেন উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া যায়। গুরুতর রোগী হলে চট্টগ্রাম নগরীতে নেওয়ার প্রয়োজন কমে আসুক—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
বিশেষ করে কিডনি রোগীদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস একটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রক্রিয়া হওয়ায় কাছাকাছি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই সেবা চালু হলে রোগীদের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হতে পারে।
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা এখন ঘোষণার বাস্তবায়ন ঘিরে। ১৫১ শয্যার উন্নয়ন, ডায়ালাইসিস ইউনিট, প্রয়োজনীয় মেশিন, জনবল, প্যাথলজি সেবা, মাতৃ ও নবজাতক সেবা—প্রতিটি উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে মডেল হাসপাতালে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে শয্যা বৃদ্ধি, ডায়ালাইসিস, উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মাতৃ ও নবজাতক সেবা এবং জনবল বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগ হাসপাতালটির সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় ইতোমধ্যে পটিয়ার মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এখন সেই প্রত্যাশাকে বাস্তব সেবায় রূপ দিতে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ, টেন্ডার প্রক্রিয়া, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
পটিয়া হাসপাতালের ঘোষিত উন্নয়ন পরিকল্পনা
- হাসপাতালকে মডেল হাসপাতালে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা
- ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ
- আগামী ১৫ দিনের মধ্যে টেন্ডার কার্যক্রম শুরুর কথা
- ডায়ালাইসিসের জন্য ১০টি শয্যার পরিকল্পনা
- আগামী দুই বছরে ১০টি ডায়ালাইসিস মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনা
- প্রতিদিন প্রায় ২০ জন রোগীর ডায়ালাইসিস সেবার সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে
- প্রয়োজন অনুযায়ী ৯ জন জনবল পদায়নের সিদ্ধান্ত
- উন্নতমানের প্যাথলজি সেবা চালুর উদ্যোগ
- প্রসূতি মায়েদের জন্য ২০ শয্যার পরিকল্পনা
- নবজাতকদের জন্য ২০ শয্যার পরিকল্পনা
- ভর্তি রোগীদের পরীক্ষা, ওষুধ, স্যালাইন ও খাবারের মান নিশ্চিত করার নির্দেশ
পটিয়ার স্বাস্থ্যসেবার এই নতুন পরিকল্পনা এখন কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়—সেদিকেই তাকিয়ে স্থানীয় জনগণ। হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়লে চিকিৎসার জন্য দূরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং পটিয়া হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র।

