মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু মহামানবের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন ও কর্ম একটি নির্দিষ্ট সময়, ভূখণ্ড কিংবা সম্প্রদায়ের গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলেছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁদের অন্যতম। সপ্তম শতকের আরব উপদ্বীপে তাঁর আবির্ভাব শুধু ধর্মীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নয়; তাঁর জীবন সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমা, সামাজিক ন্যায় ও আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে মুসলিমদের কাছে আদর্শ হয়ে আছে।
মুসলিম ঐতিহ্য অনুযায়ী, তিনি ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তাঁর ওপর নাজিল হয় পবিত্র কুরআন, যা ইসলামের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। প্রায় ২৩ বছর ধরে তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত, ন্যায়নীতি, সৎ জীবন, দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা এবং নৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে আহ্বান জানান।
জন্ম ও শৈশব
হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা নগরীতে কুরাইশ বংশের বনু হাশিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রচলিত ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী তাঁর জন্ম আনুমানিক ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে, যে সময়কে আরব ইতিহাসে ‘আমুল ফিল’ বা হাতির বছর হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব তাঁর জন্মের আগেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে জন্মের আগেই তিনি পিতৃহারা হন। তাঁর মাতা আমিনা বিনতে ওয়াহাব ছিলেন তাঁর শৈশবের প্রথম আশ্রয়।
আরব সমাজের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী শিশুকালে তাঁকে মরুভূমির পরিবেশে লালন-পালনের জন্য দুধমাতা হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে দেওয়া হয়েছিল বলে ইসলামী ঐতিহ্যে বর্ণিত হয়েছে।
শৈশবেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। প্রায় ছয় বছর বয়সে তাঁর মা আমিনা মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁর দায়িত্ব নেন। দাদার মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তাঁকে লালন-পালন করেন।
শৈশবের এই অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী জীবনে এতিম, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ইসলামী শিক্ষায় বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
কৈশোর ও কর্মজীবন
কৈশোর থেকেই হজরত মুহাম্মদ (সা.) পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল ও সৎ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক সফরে অংশ নেন।
তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সত্যবাদিতা ও আমানতদারি। মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’—অর্থাৎ বিশ্বস্ত—এবং ‘আস-সাদিক’—অর্থাৎ সত্যবাদী—নামে অভিহিত করত বলে ইসলামী ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে।এটি তাঁর নবুয়ত-পূর্ব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ ইসলাম প্রচারের আগেই তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা মক্কার সমাজে সুপরিচিত ছিল।হজরত খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহব্যবসায়িক সততা ও দক্ষতার কারণে তিনি মক্কার সম্মানিত ব্যবসায়ী হজরত খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায়িক কাজে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হয়।খাদিজা (রা.) তাঁর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহচর ছিলেন। নবুয়তের সূচনালগ্নে যখন তিনি গভীর মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন খাদিজা (রা.) তাঁকে সান্ত্বনা ও সমর্থন দেন বলে ইসলামী বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।তাঁদের সংসার ছিল পারস্পরিক আস্থা, ভালোবাসা ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে মুসলিম সমাজে বিবেচিত।হেরা গুহা ও প্রথম ওহি মক্কার সমাজে তখন নানা ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক অনাচার প্রচলিত ছিল। মূর্তিপূজা, গোত্রীয় সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য এবং দুর্বল মানুষের অধিকারহীনতা ছিল তৎকালীন আরব সমাজের আলোচিত বৈশিষ্ট্য। হজরত মুহাম্মদ (সা.) নির্জনতা পছন্দ করতেন এবং মক্কার নিকটবর্তী হেরা গুহায় ধ্যান ও ইবাদতে সময় কাটাতেন বলে ইসলামী ঐতিহ্যে বর্ণিত হয়েছে। প্রচলিত ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, তাঁর বয়স যখন ৪০ বছর, তখন রমজান মাসে হেরা গুহায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁর কাছে প্রথম ওহি নাজিল হয়। সূরা আলাকের প্রথম আয়াতগুলো দিয়ে ওহির সূচনা হয় বলে মুসলিম ঐতিহ্যে বর্ণিত। এর মধ্য দিয়ে তাঁর নবুয়তের দায়িত্ব শুরু হয়।
ইসলামের প্রথম আহ্বান
প্রথম দিকে তিনি নিকটজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। তাঁর প্রতি প্রথম ঈমান গ্রহণকারীদের মধ্যে হজরত খাদিজা (রা.), হজরত আলী (রা.), হজরত আবু বকর (রা.) এবং যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)-এর নাম ইসলামী ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর দাওয়াত প্রকাশ্য রূপ নেয়। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত, মূর্তিপূজা পরিত্যাগ, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, দানশীলতা ও পরকালের জবাবদিহিতার দিকে আহ্বান জানান।
মক্কায় নির্যাতন ও প্রতিকূলতা
ইসলামের প্রচার মক্কার প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করলে তাঁর বিরোধিতা বাড়তে থাকে। প্রথম মুসলিমদের অনেকেই নির্যাতনের শিকার হন। সামাজিক বয়কট, অর্থনৈতিক চাপ, উপহাস ও নানা ধরনের নিপীড়নের মধ্যেও হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর প্রচারকাজ চালিয়ে যান।মক্কার এই কঠিন সময়ে তিনি তাঁর অনুসারীদের ধৈর্য, ঈমান ও নৈতিকতার ওপর অবিচল থাকার শিক্ষা দেন।
হাবশায় হিজরত
নির্যাতনের এক পর্যায়ে কিছু মুসলিমকে হাবশা বা বর্তমান ইথিওপিয়ার দিকে হিজরত করার অনুমতি দেওয়া হয়। ইসলামী ঐতিহ্যে হাবশার খ্রিস্টান শাসক নাজাশির ন্যায়পরায়ণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনা ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায় যে প্রথম মুসলিম সমাজ রাজনৈতিক বা গোত্রীয় শক্তির পরিবর্তে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের আশ্রয় খুঁজেছিল।
‘আমুল হুজন’—দুঃখের বছর
নবুয়তের দশম বছরের কাছাকাছি সময়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে পরপর দুটি বড় ব্যক্তিগত আঘাত আসে। তাঁর স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিব মৃত্যুবরণ করেন।ইসলামী ইতিহাসে এ সময়কে ‘আমুল হুজন’—দুঃখের বছর বলা হয়।
খাদিজা (রা.) ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রধান সহায়কদের একজন, আর আবু তালিব ছিলেন মক্কার কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক রক্ষাকবচ। তাঁদের মৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর শোকের সৃষ্টি করে।
তায়েফ সফর
মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হজরত মুহাম্মদ (সা.) তায়েফে যান। সেখানে তিনি প্রত্যাশিত সমর্থন পাননি এবং কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।ইসলামী বর্ণনায় তাঁর এই সময়ের ধৈর্য, দোয়া ও ক্ষমাশীলতা বিশেষভাবে আলোচিত। প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি প্রতিশোধপরায়ণতার পরিবর্তে আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও মানুষের হেদায়েতের আশা বজায় রাখেন।
মিরাজ
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অলৌকিক ঘটনা হলো ইসরা ও মিরাজ। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, তাঁকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় এবং এরপর ঊর্ধ্বলোকে তাঁর বিশেষ যাত্রা সংঘটিত হয়।মিরাজের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার ঘটনাটি ইসলামী ঐতিহ্যে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
মদিনায় হিজরত
মক্কায় দীর্ঘ সময়ের দাওয়াত ও প্রতিকূলতার পর ইয়াসরিবের—পরবর্তীকালে মদিনা—কিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে সেখানে আসার আহ্বান জানান।৬২২ খ্রিস্টাব্দে হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। এই হিজরত ইসলামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।
পরবর্তীতে ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনাবিন্দু হিসেবে হিজরতকে গ্রহণ করা হয়।
মদিনায় নতুন সমাজব্যবস্থা
মদিনায় এসে হজরত মুহাম্মদ (সা.) শুধু ধর্মীয় নেতা হিসেবেই নয়, একটি নতুন সমাজের নেতৃত্বদাতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।মক্কা থেকে আগত মুহাজির এবং মদিনার আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ও সামাজিক দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য মদিনার সনদ বা ‘সাহিফা’ সম্পর্কিত ঐতিহাসিক বর্ণনাও পাওয়া যায়।মদিনায় মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামো ক্রমে সুসংগঠিত হয়।
বদর, উহুদ ও খন্দকের সময়
মদিনা পর্বে মুসলিম সমাজকে বিভিন্ন সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি হতে হয়। বদরের যুদ্ধ, উহুদের যুদ্ধ এবং খন্দকের যুদ্ধ ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের সামরিক সাফল্য তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। উহুদের যুদ্ধে তারা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। খন্দকের যুদ্ধে মদিনার প্রতিরক্ষায় পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ করা হয়।এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থানও পরিবর্তিত হতে থাকে।
হুদায়বিয়ার সন্ধি
মক্কায় ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে মুসলিমরা হুদায়বিয়ায় পৌঁছালে মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়।প্রথম দৃষ্টিতে চুক্তির কিছু শর্ত মুসলিমদের জন্য কঠিন মনে হলেও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে এটি মক্কা ও মুসলিম সমাজের মধ্যে সংঘাত কমানোর এবং ইসলামের বার্তা বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করে বলে ইসলামী ইতিহাসে বিবেচিত হয়।
মক্কা বিজয়
হুদায়বিয়ার চুক্তি ভঙ্গের পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিমরা মক্কায় প্রবেশ করে।মক্কা বিজয়ের অন্যতম আলোচিত দিক হলো সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা। বহু বছর নির্যাতন ও বিরোধিতার পরও ব্যাপক প্রতিশোধ গ্রহণের পরিবর্তে ক্ষমার নীতি গ্রহণ করা ইসলামী ঐতিহ্যে তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।কাবা শরিফ থেকে মূর্তিগুলো অপসারণ করা হয় এবং মক্কা ইসলামের কেন্দ্রীয় পবিত্র নগরীতে পরিণত হয়।
বিদায় হজ
জীবনের শেষ দিকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে হজ পালন করেন। এটি তাঁর জীবনের শেষ হজ হওয়ায় ইতিহাসে বিদায় হজ নামে পরিচিত।
বিদায় হজের সময় তাঁর ভাষণে মানবিক মর্যাদা, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, পারস্পরিক অধিকার এবং নৈতিক দায়িত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায় বলে ইসলামী বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।বিদায় হজের ভাষণ মুসলিম সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও সামাজিক নির্দেশনার উৎস হিসেবে বিবেচিত।
শেষ জীবন ও ইন্তেকাল
বিদায় হজের কিছুদিন পর হজরত মুহাম্মদ (সা.) অসুস্থ হন। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৬৩ বছর।তাঁকে মদিনার মসজিদে নববীর সংলগ্ন তাঁর বাসগৃহের স্থানে দাফন করা হয়, যা বর্তমানে রওজা শরিফ হিসেবে বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান।
তাঁর চরিত্র ও নৈতিক শিক্ষা
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন শুধু ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সমষ্টি নয়; মুসলমানদের কাছে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক আদর্শ।তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
সত্যবাদিতা: কথা ও কাজে সত্যের প্রতি অবিচল থাকা।
আমানতদারি: মানুষের দায়িত্ব ও সম্পদকে বিশ্বাসের সঙ্গে রক্ষা করা।ন্যায়বিচার: ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।দয়া ও মানবিকতা: দরিদ্র, এতিম, অসহায় ও দুর্বল মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।ক্ষমাশীলতা: ব্যক্তিগত প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও সংশোধনের সুযোগ দেওয়া।
ধৈর্য: বিপদের সময় হতাশ না হয়ে নৈতিক অবস্থানে অটল থাকা।জ্ঞান ও চিন্তা: কুরআনের প্রথম নাজিল হওয়া আয়াতগুলোর মধ্যেই পড়া ও জ্ঞানের প্রতি গুরুত্বের বিষয়টি মুসলিম ঐতিহ্যে বিশেষভাবে আলোচিত।
নারী, এতিম ও দুর্বল মানুষের অধিকার
প্রাক-ইসলামী আরব সমাজের বিভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে নারীর অধিকার, এতিমের সম্পদ, দরিদ্রের অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে ইসলামী শিক্ষায় নতুন জোর দেওয়া হয়।
পবিত্র কুরআন ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা এতিমের সম্পদ রক্ষা, নারীর উত্তরাধিকার, বিবাহে দায়িত্ব, দরিদ্রের প্রতি সহায়তা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়।
এ কারণে তাঁর জীবন ইসলামী সামাজিক নীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
প্রতিবেশী ও অমুসলিমদের সঙ্গে আচরণ
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনীতে প্রতিবেশীর অধিকার, অঙ্গীকার রক্ষা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে চুক্তি ও সামাজিক সম্পর্কের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
মদিনার সমাজে মুসলিমদের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় ও গোত্রীয় সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করত। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার জন্য বিভিন্ন চুক্তি ও সামাজিক বিধান গড়ে ওঠে।
তাঁর শিক্ষায় অন্যায়, বিশ্বাসঘাতকতা ও জুলুম থেকে বিরত থাকা এবং অঙ্গীকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব ইতিহাসে প্রভাব
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলাম আরব উপদ্বীপের বাইরে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইসলাম এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায়।
ইসলামী সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাহিত্য, স্থাপত্য ও শিক্ষার নানা ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অগ্রগতি ঘটে।
তবে এই দীর্ঘ ইতিহাসের মূল ভিত্তি হিসেবে মুসলমানদের কাছে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, তাঁর সুন্নাহ এবং পবিত্র কুরআনের শিক্ষা বিশেষ মর্যাদা বহন করে।
আজকের পৃথিবীতে তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা
বর্তমান পৃথিবীতে যুদ্ধ, বৈষম্য, সহিংসতা, দারিদ্র্য, সামাজিক অবিচার ও নৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। এমন বাস্তবতায় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন থেকে মুসলিমরা সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীলতা, মানবিকতা, ক্ষমাশীলতা ও সামাজিক সংহতির শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে দেখা যায়—ধর্মীয় বিশ্বাসকে শুধু ব্যক্তিগত আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিকতা, চরিত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা।
উপসংহার
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। মক্কার এক এতিম শিশুর জীবন থেকে নবুয়ত, নির্যাতন, হিজরত, মদিনায় সমাজ প্রতিষ্ঠা, মক্কা বিজয় এবং বিদায় হজ—প্রতিটি অধ্যায় ইসলামের ইতিহাসে গভীর তাৎপর্য বহন করে।
তাঁর জীবনের আলোচনায় শুধু ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো নয়, তাঁর চরিত্র, নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের কাছে তিনি আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসুল এবং তাঁর সুন্নাহ ধর্মীয় জীবনের অন্যতম প্রধান আদর্শ।
ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও তাঁর নাম বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর জীবন তাই শুধু অতীতের একটি অধ্যায় নয়—মুসলিমদের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনে তা বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশ।

