পারিবারিক শান্তির মূলভিত্তি পারস্পরিক সম্মান—অধিকার জানুন, দায়িত্ব পালন করুন

স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও দায়িত্ব: সমতা, সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিবার

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

একটি পরিবার শুধু রক্তের সম্পর্ক কিংবা সামাজিক বন্ধনের নাম নয়; এটি পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান, দায়িত্ব ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কের স্থায়িত্ব অনেকাংশে নির্ভর করে দুজনের পারস্পরিক অধিকারকে সম্মান করা এবং দায়িত্বশীল আচরণের ওপর। দাম্পত্য জীবনে একজনের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অন্যজনের অধিকারও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে নাগরিকদের সমতার কথা বলে এবং নারী-পুরুষের সমঅধিকারের নীতি স্বীকার করে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে।

তবে বিবাহিত জীবনের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণে ব্যক্তির ধর্ম, বিবাহের ধরন এবং প্রযোজ্য পারিবারিক আইনও গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বামী-স্ত্রীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করার সময় সাধারণ নৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনও বিবেচনায় নিতে হয়।দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সম্মান স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের প্রথম ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান। মতের অমিল হতে পারে, কিন্তু মতের অমিলকে কেন্দ্র করে অপমান, ভয় দেখানো, জোরজবরদস্তি কিংবা নির্যাতন কোনো সুস্থ পারিবারিক সম্পর্কের অংশ হতে পারে না। একজন স্ত্রী যেমন স্বামীর সম্মান, ব্যক্তিগত পরিসর ও মতামতকে গুরুত্ব দেবেন, তেমনি স্বামীরও স্ত্রীর মতামত, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত অধিকারকে সম্মান করা প্রয়োজন।পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও একতরফা কর্তৃত্বের পরিবর্তে আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক বিষয়, সন্তানদের শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা কিংবা পারিবারিক ভবিষ্যৎ—গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উভয়ের মতামত বিবেচনা করা পারিবারিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে।স্ত্রীর অধিকার বিবাহিত জীবনে স্ত্রীর অধিকার শুধু পারিবারিক যত্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মর্যাদা, নিরাপত্তা, আইনগত অধিকার এবং বৈধ পাওনাও গুরুত্বপূর্ণ।মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে দেনমোহর একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিষয়। বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে দেনমোহর সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। নিকাহনামায় দেনমোহর পরিশোধের পদ্ধতি উল্লেখ না থাকলে আইন অনুযায়ী পুরো দেনমোহর দাবির সঙ্গে পরিশোধযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিধান রয়েছে।একইভাবে, স্বামীর পক্ষ থেকে যথাযথ ভরণপোষণ না দেওয়া হলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৯-এ প্রতিকার চাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করে সালিশি পরিষদের মাধ্যমে ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণের বিধানও রয়েছে।স্বামীর অধিকার ও দায়িত্ব

দাম্পত্য সম্পর্ক একতরফা অধিকারভোগের বিষয় নয়। স্বামীরও পারিবারিক জীবনে সম্মান, সহযোগিতা ও ন্যায়সংগত আচরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

একই সঙ্গে স্বামীর ওপরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে—স্ত্রী ও সন্তানদের প্রয়োজনীয় দেখভাল করা, পরিবারের নিরাপত্তা ও কল্যাণের দিকে নজর দেওয়া এবং স্ত্রীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ করা।অর্থনৈতিক সামর্থ্য অনুযায়ী সংসারের প্রয়োজন মেটানো এবং পারিবারিক সিদ্ধান্তে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

ভরণপোষণ: দায়িত্ব ও আইন ভরণপোষণ নিয়ে দাম্পত্য জীবনে অনেক সময় বিরোধ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে স্ত্রীকে যথাযথ ভরণপোষণ না দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে।এ ছাড়া পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সন্তানদের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধানের মতো বিষয় রয়েছে।তাই কোনো দাম্পত্য বিরোধ দেখা দিলে শুধু সামাজিক চাপ বা পারিবারিক সালিশের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।বিবাহ নিবন্ধনের গুরুত্ব বিবাহের আইনগত প্রমাণ ভবিষ্যতে বিভিন্ন অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 অনুযায়ী মুসলিম আইনে সম্পাদিত বিবাহ নিবন্ধনের বিধান রয়েছে।বিবাহের নিবন্ধন, নিকাহনামা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা ভবিষ্যৎ বিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজে আসতে পারে।একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে আইনি বিধান মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৬ অনুযায়ী বিদ্যমান বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় আরেকটি বিবাহ করতে হলে Arbitration Council-এর পূর্ব লিখিত অনুমতির বিধান রয়েছে। আইনে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ কারণে প্রচলিত সামাজিক ধারণার ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা জরুরি।বিবাহবিচ্ছেদেও রয়েছে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া

দাম্পত্য সম্পর্ক কোনো কারণে ভেঙে গেলে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ধারা ৭ অনুযায়ী তালাক উচ্চারণের পর সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দেওয়ার বিধান রয়েছে এবং নোটিশের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুনর্মিলনের উদ্দেশ্যে Arbitration Council গঠনের ব্যবস্থাও রয়েছে।অন্যদিকে, স্ত্রীকে বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষমতা যথাযথভাবে অর্পণ করা থাকলে তিনি তা প্রয়োগ করতে পারেন; এ ক্ষেত্রেও আইনে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।তাই রাগের মুহূর্তে মৌখিক ঘোষণা বা সামাজিক চাপের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।সন্তানের বিষয়ে উভয়ের দায়িত্ব

সন্তান একটি দাম্পত্য সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি। সন্তানের খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশের বিষয়ে মা-বাবা উভয়েরই দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।

দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে বিরোধ থাকলেও সন্তানকে কেন্দ্র করে প্রতিহিংসা, ভয় দেখানো কিংবা তার শিক্ষা ও মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয়।

বাংলাদেশের পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে সন্তানদের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধানের বিষয়ও রয়েছে।পারিবারিক সহিংসতা ও অপমানের বিরুদ্ধে সচেতনতা

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ স্বাভাবিক হলেও শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনকে পারিবারিক সমস্যার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা উচিত নয়।অপমান, ভয় দেখানো, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল করে রাখা বা অন্য কোনো ধরনের নির্যাতন দেখা দিলে নিরাপদ ও আইনসম্মত সহায়তার পথ খুঁজে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা যেন কোনো পক্ষকে অন্ধভাবে সমর্থন না করে বরং নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানকে গুরুত্ব দেন।অর্থনৈতিক অধিকার ও স্বচ্ছতা সংসারের অর্থনৈতিক বিষয় নিয়েও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। আয়, ব্যয়, ঋণ, সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে পারস্পরিক আলোচনা পারিবারিক বিরোধ কমাতে পারে।একজন উপার্জন করেন আর অন্যজন সংসার পরিচালনা করেন—এমন পরিবারেও উভয়ের অবদানকে সম্মানের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ঘরের কাজ ও সন্তান লালন-পালনের শ্রমও পারিবারিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।মতামতের স্বাধীনতা স্বামী বা স্ত্রী কেউই অন্যজনের ব্যক্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারী নন। পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দেওয়া, নিজের প্রয়োজন ও উদ্বেগ প্রকাশ করা এবং সম্মানজনকভাবে ভিন্নমত পোষণ করা দাম্পত্য জীবনের সুস্থ যোগাযোগের অংশ।তবে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্ব ও পারস্পরিক আস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।বিরোধ দেখা দিলে করণীয়

দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলে প্রথম পর্যায়ে শান্তভাবে আলোচনা করা যেতে পারে। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা, সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা জরুরি।সমাধান সম্ভব না হলে বিশ্বস্ত পরিবারের সদস্য, নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী বা উপযুক্ত আইনগত পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। আর নির্যাতন বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে বিষয়টিকে সাধারণ পারিবারিক ঝগড়া হিসেবে না দেখে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও আইনগত সহায়তা নেওয়া উচিত।তথ্যভিত্তিক আইনগত বিষয় ও মতামত আলাদা রাখা জরুরি

তথ্যভিত্তিক বিষয়: বাংলাদেশের সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং নারী-পুরুষের সমঅধিকারের নীতি স্বীকার করে। মুসলিম পারিবারিক আইন ও পারিবারিক আদালত সম্পর্কিত আইনে বিবাহ, দেনমোহর, ভরণপোষণ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং সন্তানের অভিভাবকত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।

মতামত: একটি শান্তিপূর্ণ পরিবার গড়ে তুলতে শুধু আইন জানা যথেষ্ট নয়; পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা এবং খোলামেলা যোগাযোগও প্রয়োজন। কোনো পক্ষের অধিকারকে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করে উভয়ের ন্যায্য অধিকার ও দায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়া পারিবারিক স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক হতে পারে।স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়—এটি পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক। একজনের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে অন্যজনের অধিকার অস্বীকার করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি পারিবারিক শান্তির নামে কারও বৈধ অধিকার বা নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।সুস্থ পরিবার গড়তে প্রয়োজন আইন সম্পর্কে সচেতনতা, পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্বশীল আচরণ এবং ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত। দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলে আবেগের পরিবর্তে তথ্য ও আইন জানা, প্রয়োজন হলে পেশাদার আইনগত পরামর্শ নেওয়া এবং নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

Similar Articles

Single Sidebar 1
  • সর্বশেষ
  • পঠিত