চট্টগ্রামের পটিয়ায় মিষ্টি ও খাদ্যজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফুলকলি ফ্যাক্টরির দূষণ নিয়ে সংসদ সদস্য এনামুল হক এনামকে ‘ভুল তথ্য’ দেওয়ার অভিযোগে এক বিএনপি নেতাকে শাসিয়েছেন তিনি। ওই নেতা হলেন জঙ্গলখাইন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সেলিমউদ্দিন।
শুক্রবার দুপুরে উপজেলার নাইখাইন এলাকায় ফুলকলি ফ্যাক্টরির দূষণ পরিস্থিতি দেখতে যান সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম। এ সময় তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে কারখানাটির বর্জ্য, দুর্গন্ধ ও পরিবেশ দূষণের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, কারখানাটিকে ঘিরে এখনো দুর্গন্ধ ও পরিবেশ দূষণের সমস্যা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ শোনার পর সেখানে উপস্থিত বিএনপি নেতা সেলিমউদ্দিনের কাছেও বিষয়টি জানতে চান এমপি এনাম। একপর্যায়ে তাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘তুমি তো দুর্গন্ধ নেই বলেছিলে। তোমার স্বার্থ বড় নাকি জনগণের স্বার্থ বড়? তুমি ভিন্ন কথা (ভুল তথ্য) বলেছিলে কেন?’
জানা গেছে, এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার সময় নাইখাইন এলাকায় গিয়ে ফুলকলি ফ্যাক্টরির দূষণ ও তীব্র দুর্গন্ধের বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ শুনেছিলেন এনামুল হক এনাম। নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি একাধিকবার ফ্যাক্টরি ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও তিনি কারখানাটি পরিদর্শন করে দূষণ ও দুর্গন্ধের সমস্যা সমাধানে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন।
এ ছাড়া গত মে মাসে ফুলকলি ফ্যাক্টরিতে অভিযান চালিয়ে দূষিত বর্জ্য ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভিযোগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটিকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করে। ওই সময় এমপি এনামুল হক এনামও কারখানাটি পরিদর্শন করেন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ইটিপি চালুর বিষয়ে নির্দেশনা দেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ফুলকলি ফ্যাক্টরির বর্জ্য সার্জেন্ট মহি আলম খালে পড়ার কারণে খালের পানি দূষিত হচ্ছে। এতে আশপাশের কৃষিজমি ও জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এর আগে ২০১৯ সালে ইটিপি অকার্যকর রেখে অপরিশোধিত তরল বর্জ্য খালে ফেলার অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর ফুলকলি ফ্যাক্টরিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল।
তবে স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কারখানাটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপি নেতা সেলিমউদ্দিনেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতা সেলিমউদ্দিনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, পটিয়া ফুলকলি ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসিম উদ্দিনের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি প্রশ্ন শোনার পর কথা না বলে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
বিষাক্ত বর্জ্য খালে পড়ে পানি দূষিত করে তুললেও পরিবেশ অধিদপ্তর অজানা কারণে নীরব। জোয়ার-ভাটার এই খালটির সঙ্গে চাঁনখালী, বোয়ালখালী খাল ও কর্তফুলী নদীর সংযোগ রয়েছে। ফলে জোয়ার ও ভাটার সময় কর্তফুলী নদীতেও বিষাক্ত বর্জ্য পতিত হচ্ছে। দূষিত পানির কারণে খালে জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে । খালের পাশ দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের প্রতিদিন শত শত যাত্রীকে ভোগান্তিতে পড়তে হয় বিষাক্ত পানির দুর্গন্ধে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পার্শ্বে পটিয়া উপজেলার আমজুর হাট মোড় থেকে শুরু করে মনসা বাদামতল এলাকার প্রায় ১৫ কিলোমিটার বিস্তীর্ণ সার্জেন্ট মহি আলম খাল।

এই খালের পানি দিয়ে উপজেলার উজিরপুর,নাইখাইন, গৈড়লা, লড়িহরা, দক্ষিণ হুলাইন, এয়াকুবন্ডী তিয়ারকুল, পৌর এলাকার উজিরপুর, উনাইনপুরা ও পৌরসভার আল্লাই এলাকার কয়েকশ’ কৃষক ধানিজমিতে প্রতি মৌসুমে চাষাবাদ করে থাকেন। শাহ আমানত নিটিং এ্যান্ড ডাইং ও জঙ্গলখাইন কৃষি উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্মুখে গড়ে ওঠা ফুলকলি ফুড প্রোডাক্টসের বিষাক্ত বর্জ্য খালে ছেড়ে দেয়ার কারণে পরিবেশ বিপর্যয় ও চাষাবাদ বন্ধ হয়ে পড়েছে। এলাকার কৃষকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে খালের পানি পরীক্ষা করে দূষিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে এই খালের পানিতে এসিডিটির মাত্রা ৪.২ পাওয়া গেছে। সাধারণত পানিতে ৬.৫ থেকে ৭ পর্যন্ত এসিডিটির মাত্রা থাকে। খালের এই পানি দিয়ে বোরো চাষাবাদ করলে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিদিন যারা এই রুট দিয়ে চট্টগ্রাম শহরে যান তাঁরা গৈড়লার মোড় থেকে বাদামতল এলাকা পর্যন্ত বাজে দুর্গন্ধ থেকে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। এই দুর্গন্ধ বন্ধ করার জন্য মনে হয় কেউ নেই। অনতিবিলম্বে কারখানার বর্জ্য নিষ্কাঃসন খালে বন্ধের দাবী জানান। যদি তা করা না হয়, তাহলে আগামীতে বৃহৎ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান এলাকাবাসী।

