কানাডায় সাময়িক রেসিডেন্স ভিসা (টিআরভি) আবেদনের সঙ্গে জড়িত কথিত অভিবাসন জালিয়াতির একটি ঘটনা সামনে এসেছে। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (সিবিএসএ) তদন্তে ২০৯ জন বাংলাদেশি নাগরিকের নামে জমা দেওয়া ২৪৩টি ভিসা আবেদন শনাক্ত করা হয়েছে। এসব আবেদনে জাল নথি ও মিথ্যা তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে কানাডার কর্তৃপক্ষ।
সিবিএসএর ২২ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তদন্তের সূত্র ধরে কুইবেকের ভ্যালিফিল্ড আদালতে চারজনের বিরুদ্ধে কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং পঞ্চম একজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কথা জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করার আইনি নীতি প্রযোজ্য থাকবে।
যেভাবে সামনে আসে ঘটনা
কানাডার কুইবেক প্রদেশের মার্সিয়ের এলাকায় ২০২৪ সালের ৩ জুলাই একটি ব্যক্তিগত বাসভবনে নিয়মিত যাচাই কার্যক্রম চালায় সিবিএসএ। এ সময় সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ ও ফায়ার বিভাগের প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
যাচাইয়ের সময় কানাডার অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের সম্ভাব্য কিছু আলামত পাওয়ার পর ২০২৪ সালের আগস্টে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা হয়।
তদন্তে দেখা যায়, ২০৯ জন বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য মোট ২৪৩টি টিআরভি আবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল। আবেদনগুলোতে কানাডার নাগরিকদের আমন্ত্রণকারী বা আতিথ্যদাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে তদন্তকারী সংস্থা। এসব আবেদনে জাল নথি ও মিথ্যা বিবৃতি ব্যবহারের মাধ্যমে ভিসা পাওয়ার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল বলে সিবিএসএর দাবি।
কুইবেক ও অন্টারিওতে তল্লাশি
তদন্তের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৩ জুন কুইবেক ও অন্টারিও প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে চারটি তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়। এ সময় বিভিন্ন নথিপত্র ও কম্পিউটার সরঞ্জাম জব্দ করা হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তদন্তের পরিধি বড় হওয়ায় শনাক্ত করা ২৪৩টি আবেদনের মধ্যে ৭৯টি আবেদনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। এসব আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি ও অন্যান্য আলামত তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
কী ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে?
কানাডার অভিবাসন ও শরণার্থী সুরক্ষা আইন (আইআরপিএ) অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তিন ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
১. কানাডায় ব্যক্তিদের প্রবেশের ব্যবস্থা করা বা অবৈধ প্রবেশে সহায়তার ষড়যন্ত্র।
২. অভিবাসন আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিকৃত করা বা গোপন করতে জেনেশুনে সহায়তা করা।
৩. কানাডার অভিবাসন আইন লঙ্ঘনে জেনেশুনে অন্যদের সহায়তা বা প্ররোচনা দেওয়া।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে এসব অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
২০৯ বাংলাদেশির সবার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ?
এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তদন্তে ২০৯ জন বাংলাদেশি নাগরিকের নাম বা আবেদন শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে।
সিবিএসএর প্রকাশিত তথ্যে ২০৯ জনের জন্য জমা দেওয়া ভিসা আবেদনগুলোর কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, কথিত জালিয়াতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠক ও সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রত্যেক আবেদনকারীর ভূমিকা, সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা এবং তাঁরা কোনো অনিয়ম সম্পর্কে জানতেন কি না—এসব বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের প্রত্যেকের ভিসার বর্তমান অবস্থা বা তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থায় জালিয়াতি নিয়ে উদ্বেগ
কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থায় ভুয়া নথি, মিথ্যা তথ্য কিংবা সাজানো আমন্ত্রণপত্র ব্যবহার করে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা গুরুতর আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় শুধু আবেদনকারী নয়, আবেদন প্রস্তুত বা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও তদন্তের আওতায় আসতে পারেন—যদি তাঁদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।
কানাডার জননিরাপত্তামন্ত্রী গ্যারি আনান্দাসাঙ্গারী বলেছেন, দেশটির অভিবাসনব্যবস্থা সততা, ন্যায্যতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই ব্যবস্থাকে প্রতারণার মাধ্যমে ব্যবহার করার চেষ্টা করলে গুরুতর পরিণতি হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
বিদেশে ভ্রমণ, পড়াশোনা কিংবা কাজের উদ্দেশ্যে আবেদন করার ক্ষেত্রে নথির সত্যতা ও তথ্যের নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবেদন করা হলেও জমা দেওয়া তথ্য ও কাগজপত্র সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়ার নামে কেউ মিথ্যা তথ্য, ভুয়া আমন্ত্রণপত্র কিংবা জাল নথি ব্যবহারের প্রস্তাব দিলে সতর্ক থাকা উচিত। এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিসা প্রত্যাখ্যান, অভিবাসনসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা বা অন্যান্য আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কানাডায় ২০৯ জন বাংলাদেশির নামে জমা দেওয়া ২৪৩টি টিআরভি আবেদন ঘিরে কথিত জালিয়াতির তদন্ত আন্তর্জাতিক অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নথির সত্যতা ও স্বচ্ছতার গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। তবে তদন্তে নাম আসা, ভিসার আবেদন জমা পড়া এবং অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়। আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া ও প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা যাচাইয়ের মাধ্যমেই অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
সূত্র: কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (সিবিএসএ), ২২ অক্টোবর ২০২৬-এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।

