পাঁচ দশক নয়, শতবর্ষের সম্প্রীতির ইতিহাসও বহন করছে পটিয়া ধলঘাটের মসজিদ-মন্দির

পটিয়ার ধলঘাটে পাঁচ দশকের সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের কৃষ্ণখালী দেওয়ান হাট এলাকায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা একটি মসজিদ ও একটি মন্দির দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত। মুসলমানদের ইবাদতের স্থান কৃষ্ণখালী দেওয়ান হাট জামে মসজিদ এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় কৃষ্ণখালী মাতৃমন্দির—দুটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান স্থানীয় মানুষের কাছে কেবল ধর্মীয় ঐতিহ্য নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতিরও প্রতীক। প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে উপাসনালয় দুটির ইতিহাস শতবর্ষেরও বেশি সময়ের বলে উল্লেখ করা হয়েছে।ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা হলেও পাশাপাশি বসবাস, সামাজিক সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান যে একটি জনপদকে সুন্দর করে তুলতে পারে, ধলঘাটের এই চিত্র সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। সময়ের পরিবর্তন, সামাজিক জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ এবং প্রজন্মের ব্যবধান পেরিয়ে এই সহাবস্থান স্থানীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ইতিহাসের পাতায় কৃষ্ণখালী দেওয়ান হাট
পটিয়া উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পরিচিত একটি জনপদ। এই অঞ্চলের কৃষ্ণখালী দেওয়ান হাট এলাকায় মসজিদ ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, কৃষ্ণখালী মাতৃমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৮ সালে। অন্যদিকে কৃষ্ণখালী দেওয়ান হাট জামে মসজিদ নির্মিত হয় ১৯৪৪ সালে। স্থানীয় সমাজসেবী আবদুল গফুর মসজিদ নির্মাণে অর্থ সহায়তা দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। মন্দিরের জন্য তৎকালীন জমিদার প্রসন্ন বাবু জায়গা দান করেছিলেন বলেও প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে। এই তথ্য অনুযায়ী, উপাসনালয় দুটি একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং ভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েও পাশাপাশি অবস্থান করছে। এ কারণেই স্থানটির ইতিহাস শুধু স্থাপনা নির্মাণের সাল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি এলাকার সামাজিক বিকাশ, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের স্মৃতি।
পাশাপাশি দুই উপাসনালয়, নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা
মসজিদে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন, আর মন্দিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা-অর্চনা করেন। ধর্মীয় রীতিনীতি ও উপাসনার ধরন আলাদা হলেও একটি এলাকায় প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা এবং অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
ধলঘাটের এই দুই উপাসনালয়ের পাশাপাশি অবস্থান সেই বিষয়টিকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। একদিকে মসজিদের মিনার ও নামাজের আহ্বান, অন্যদিকে মন্দিরের ধর্মীয় আচার—সব মিলিয়ে এলাকাটির পরিচয়ে যোগ হয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
তবে সম্প্রীতির প্রকৃত মূল্য শুধু পাশাপাশি দুটি স্থাপনা থাকা নয়। এর আসল ভিত্তি হলো মানুষের আচরণ, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে অবহেলা না করা।এই ঐতিহ্যকে আরও অর্থবহ করে তুলতে প্রয়োজন উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, সামাজিক উদ্যোগে সহযোগিতা এবং নতুন প্রজন্মকে এলাকার ইতিহাস সম্পর্কে জানানো। কারণ ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা নয়; ইতিহাস থেকে পাওয়া মূল্যবোধ বর্তমানকে সমৃদ্ধ করে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে সহায়তা করে।
ধর্মীয় সম্প্রীতি: নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গুজব কিংবা ভুল তথ্যের কারণে কখনো কখনো মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ধলঘাটের মতো ঐতিহাসিক সহাবস্থানের দৃষ্টান্তকে সামনে আনা গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই এলাকার ইতিহাস তুলে ধরা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঐতিহ্যভিত্তিক আলোচনা, স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণ সংগ্রহ এবং উপাসনালয় দুটির ইতিহাস নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান হতে পারে।
একই সঙ্গে ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাইও জরুরি। প্রতিষ্ঠার সাল, প্রতিষ্ঠাতাদের পরিচয়, পুরোনো স্থাপনার পরিবর্তন এবং স্থানীয় মানুষের স্মৃতির মধ্যে পার্থক্য থাকলে সেগুলো যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে প্রতিবেদনটি আরও নির্ভরযোগ্য হবে এবং স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জনপ্রশাসন, ইতিহাস গবেষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি এবং এলাকাবাসী সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারেন। প্রয়োজন হলে পুরোনো দলিল, ভূমির নথি, শিলালিপি ও প্রবীণদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাসগ্রন্থ বা তথ্যফলক তৈরি করা যেতে পারে।
তবে সংরক্ষণের নামে কোনো ধর্মীয় স্থাপনার নিজস্ব পরিচয় ও উপাসনার পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ধলঘাটের পরিচয় হোক সম্প্রীতি ও মানবিকতার
পটিয়ার ধলঘাটের কৃষ্ণখালী দেওয়ান হাটে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ ও মন্দিরের ইতিহাস আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, মানবিকতা ও পারস্পরিক সম্মানের প্রয়োজন সবার জন্য সমান।
এখানে মসজিদ ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান একটি দৃশ্যমান ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। সেই বৈশিষ্ট্যকে টেকসই সম্প্রীতির প্রতীকে পরিণত করতে হলে মানুষের মধ্যে আস্থা, সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।
ধলঘাটের এই ঐতিহ্য তাই শুধু পটিয়ার নয়, বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সামাজিক জীবনেরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় আসতে পারে।

Similar Articles

Single Sidebar 1
  • সর্বশেষ
  • পঠিত