যোগাযোগ অবকাঠামোয় বড় পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে পটিয়া। একই দিনে প্রায় ২১ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে দীর্ঘদিনের সংকীর্ণ ‘ছনহরা ইদ্রিস মিয়া সড়ক’ প্রশস্ত ও উন্নয়ন এবং ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে ৬৯ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ একটি আরসিসি গার্ডার ব্রিজ।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) উপজেলার ছনহরা ইউনিয়নের আলমদারপাড়া টেম্পু স্টেশন এবং শোভনদণ্ডী-মুরালী হাট সড়কে পৃথক আয়োজনে প্রকল্প দুটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম।
এলজিইডির বাস্তবায়নাধীন এ দুটি প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, সড়ক ও সেতু দুটির নির্মাণ শেষ হলে পটিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসবে।
দীর্ঘদিন ধরে সংকীর্ণতা ও ভাঙাচোরা অবস্থার কারণে ভোগান্তির কারণ হয়ে থাকা অলিরহাট জি.সি-বাথুয়া-টাঙ্গারপুল-কস্তুরীঘাট (আরএইচডি) সংযোগ সড়কটি এবার নতুন রূপ পাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ‘ছনহরা ইদ্রিস মিয়া সড়ক’ নামে পরিচিত সড়কটির প্রায় ৩ কিলোমিটার অংশ উন্নয়ন ও প্রশস্ত করা হবে। বর্তমান ১০ ফুট প্রস্থের সড়কটি বাড়িয়ে ১৮ ফুট করা হবে। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। কাজটি বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডেল্টা ইঞ্জিনিয়ার্স।
উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, গেল ২ আগস্ট ২০২৬ প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ২৪ জানুয়ারি ২০২৮ কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে সড়কটি এতটাই সংকীর্ণ যে বিপরীতমুখী যানবাহন চলাচলের সময় যানজট ও দুর্ভোগ তৈরি হয়। কৃষিপণ্য পরিবহনেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় কৃষকদের। সড়কটি ১৮ ফুটে উন্নীত হলে ছনহরা, বাথুয়া, টাঙ্গারপুল ও কস্তুরীঘাটসহ আশপাশের এলাকার সাথে পটিয়া সদরের যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি এনামুল হক এনাম বলেন, বর্তমান সরকার কথার চেয়ে কাজে বেশি বিশ্বাসী। শুধু সুন্দর সুন্দর কথা বলে উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, এলাকার উন্নয়ন হবে সবার কল্যাণের জন্য। কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণ ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়কটির নির্মাণকাজ সুষ্ঠু, সুন্দর ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, একটি উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন নির্মাণকাজে মান বজায় থাকে এবং জনগণও প্রকল্পের প্রতি দায়িত্বশীল থাকে।
অন্যদিকে একই দিনে পটিয়ায় আরও একটি বড় যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। কাঞ্চনাবাদ ইউপি (চন্দনাইশ)-শোভনদণ্ডী ইউপি-মুরালী হাট সড়কের পটিয়া অংশে চেইনেজ ৬৪০০ মিটারে নির্মাণ করা হবে ৬৯ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার ব্রিজ। সেতুটির প্রস্থ হবে ২৪ ফুট।
এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসি অ্যান্ড সিবি (জেবি)। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সেতুটি নির্মিত হলে শোভনদণ্ডী, মুরালী হাট ও আশপাশের এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
পটিয়া উপজেলা প্রকৌশলী তন্ময় নাথ বলেন, সড়ক ও সেতু দুটি প্রকল্পই এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার পাশাপাশি নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, সড়ক প্রশস্ত হওয়ার ফলে যানবাহন চলাচল সহজ হবে এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ কমবে। অন্যদিকে নতুন গার্ডার ব্রিজটি চালু হলে সংশ্লিষ্ট সড়ক যোগাযোগ আরও গতিশীল হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, পটিয়ার গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার বড় একটি সমস্যা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর সংকীর্ণতা এবং বিভিন্ন স্থানে সেতু-কালভার্টের সীমাবদ্ধতা। এ কারণে কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হয়।
দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এ পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন হবে বলে মনে করছেন তারা। তবে তাদের প্রত্যাশা, প্রকল্পের বরাদ্দের পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করে টেকসই ও মানসম্মত নির্মাণকাজ নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়কটি কাজ শেষ হওয়ার পরপরই যেন ফের সংস্কারের প্রয়োজন না পড়ে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি চান তারা।
ছনহরা ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির প্রশস্তকরণের দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এবার কাজ শুরু হওয়ায় তারা আশাবাদী। একইভাবে নতুন গার্ডার ব্রিজটি চালু হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের যাতায়াত অনেক সহজ হবে।
পটিয়া উপজেলা প্রকৌশলী তন্ময় নাথের সভাপতিত্বে সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পটিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব খোরশেদ আলম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য শফিকুল ইসলাম, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মঈনুল আলম ছোটন, বিএনপি নেতা সাইফুদ্দিন আহমেদ, ইসমাইল হোসেন, দিদারুল আলম, মঞ্জুরুল আলমসহ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

